কর্ণফুলীর উৎসমুখের সন্ধানে

জানালা ডেস্কঃ
বৃষ্টির সঙ্গে আমার চির বৈরিতা। লোকজন বৃষ্টি নিয়ে রোমান্টিক পোস্ট দিলে আমার পিত্তি জ্বলে যায়। এতবার বৃষ্টি আমার ট্যুরগুলোতে থাবা বসিয়েছে যে, বৃষ্টির নাম শুনলেই গায়ে জ্বর আসে। যথারীতি এবারো এর ব্যতিক্রম নেই। হরিণা ট্যুরের সবকিছু ঠিক করে যাওয়ার আগের দিন থেকেই বৃষ্টি শুরু হলো। যেনতেন বৃষ্টি নয়। নিম্নচাপের কারণে সারাদিন ধরে বৃষ্টি, থামার কোনো নামগন্ধ নেই। ওয়েদার ফোরকাস্ট বলে সামনের তিন দিনও বৃষ্টির হানা অব্যাহত থাকবে। ট্যুরের শুরুতেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। পূজার ছুটির কারণে একদিন ছুটি নিলেই পুরা চার দিনের ছুটি মিলে যায়। এবার তাই দলও বেশ ভারি। সব মিলিয়ে ২০ জন। বহু কষ্টে ২০টা টিকিট ম্যানেজ করলাম। তাও পিছনের সিট এভয়েড করার জন্য দুই বাসে টিকিট কাটলাম। শেষ মুহূর্তে একজনের আত্মীয় বিয়োগ হওয়ায় দলের মেম্বার ১৯ জনে নামল।

যথাসময়ে যাত্রা শুরু হলো। দলের একজন সিলেট থেকে যাত্রা করেছেন। বাস ছেড়ে দিয়েছে কিন্তু তিনি এখনো নরসিংদী। অন্য সময় বাস দেরি করে কিংবা রাস্তায় জ্যাম থাকে। আজ আশ্চর্যজনকভাবে একদম ঠিক সময়ে বাস ছেড়ে দিল আর তার চেয়েও বেশি আশ্চর্য রাস্তায় জ্যামের নামগন্ধ নেই। প্রথম বাস যথারীতি হাসান ভাই কাঁচপুর ব্রিজ পৌঁছার আগেই ক্রস করে গেল। পরের বাসে রোমেল জরুরি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার কথা বলে প্রায় ২০ মিনিট বাস দাঁড় করিয়ে রেখে হাসান ভাইকে তুলে নিল। পথে কুমিল্লা আর চট্টগ্রামে যাত্রা বিরতি দিয়ে রাঙ্গামাটি পৌঁছলাম ঠিক ভোর সাড়ে ৪টায়।

বাস থেকে নামলাম বৃষ্টি মাথায় নিয়েই। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে ভিজে কিছুদুর হেঁটে আপাত গন্তব্য ডিসি অফিসের বিশ্রামাগারে পৌঁছলাম। সেখানে ফ্রেশ হয়ে নিতেই নাস্তা হাজির। নাস্তার পর কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে ডিসি অফিসের ঘাট থেকেই নৌকায় চড়লাম। বেশ বড় ইঞ্জিন বোট, সাথে টয়লেটও আছে আপৎকালীন কাজ সারার জন্য। আগামী তিন দিন বেশিরভাগ সময় নৌকাতেই থাকতে হবে তাই আশান্বিত হলাম। ঝুম বৃষ্টিতে নৌকার ছাদে বসা যাচ্ছিল না। ছাতা নিয়ে যে দাঁড়াবো তারও উপায় নেই। প্রচণ্ড বাতাসে ছাতা তো উলটে দেয়ই, পারলে আমাদের শুদ্ধ উড়িয়ে ফেলে। সেই সাথে নৌকার দুলুনি তো আছেই। পথে এক বাজার থেকে বাজার সদাই করে আর চা খেয়ে আবার রওনা দিলাম।

বৃষ্টিতে কিছু করার নেই, অনেকেই নিচের ডেকে দেখি ঘুমের এন্তেজাম করছেন। কয়েকজনকে তো দেখলাম দিব্যি নাক ডাকছে। দেখতে দেখতে একে একে পার হয়ে এলাম শুভলং আর বরকল। বরকলে আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করে ক্যান্টিনে জিলাপি ছোলা আর মুড়ি খেয়ে বরকল বাজার একটু ঘুরে দেখে আবার রওনা দিলাম। এবার যেন প্রকৃতিদেবী কিছুটা প্রসন্ন হলেন। বৃষ্টি কিছুটা ধরে আসলে বোটের ডেকে শুরু হলো আড্ডা আর ফটোসেশন।

গল্পে গল্পে অনেকটা বেলা পার হয়ে এসেছে, পেরিয়ে এসেছি অনেকটা পথ। বৃষ্টি থামায় কিছুটা সুযোগ পেলাম প্রকৃতি উপভোগের। হরিণার কথা প্রথম শুনি ২০১৪ সালে। সেই থেকেই প্রতিবছর প্ল্যান করি, কিন্তু প্ল্যান আর বাস্তবায়ন হয় না। এবারো জুলাই মাসে প্ল্যান করে বৈরী প্রকৃতির কারণে পিছিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যা হয় হোক যাবই যাব। বন্ধু রোমেলকে বলে রেখেছিলাম কেউ না গেলেও আমরা দুই বন্ধু বেরিয়ে পড়ব। চার দিনের ছুটি মিলে যাওয়ায় আর দেরি করি নাই। পরিচিত কয়েকজনের কাছ থেকে জেনে আর নেট ঘেটে অপ্রতুল কিছু তথ্য নিয়ে বেরিয়ে পড়া। দলের বাকিরা সত্যি অর্থে জানেই না কোথায় যাচ্ছি। আমার আর রোমেলের প্রতি বিশ্বাস নিয়ে ঘর ছেড়েছে সবাই। ইভেন পরের দুই দিন কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে সেই সম্পর্কেও সবাই ছিল অন্ধকারে।

যাই হোক সকালটা বৃষ্টি মাটি করে দিলেও এখন প্রকৃতিদেবী তার রূপ রস গন্ধ সব যেন উজাড় করে ঢেলে দিলেন। দুই পাশের পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে কর্ণফুলী নদী। নদীর উজান বেয়ে চলেছি আমরা। গন্তব্য কর্ণফুলীর উৎসমুখ, মানে যেখান থেকে মিজোরামের লুসাই পাহার থেকে নেমে হরিণার ঠেগামুখ দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে রূপসী এই নদী। গত তিন দিনের টানা বৃষ্টির কারনে পাহাড়ী ঢলে নদীর পানি বেশ ঘোলা, তারপরও সৌন্দর্যের কোনো কমতি নেই। দুই ধারে উঁচু পাহাড়, কোথাও কোথাও পাহাড়ের উপরে বসতি চোখে পড়ল। কোথাও মাইলের পর মাইল কোনো লোকজনের দেখা নাই। দুইধারে শুধু সবুজ পাহাড় আর পাহাড়। বৃষ্টিস্নাত সবুজ পাহাড় চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছিল। কোথাও থেকে থেকে জেলেরা জাল পেতে রেখেছে। মাঝে একটা চ্যানেলের মত পার হয়ে এলাম। এর মধ্যে আরাফ, রাসেল ভাই, হাসান ভাই আর মেহেদি মিলে চানাচুর মাখার আয়োজন করে ফেলেছে সেই সাথে ঝালমুড়ি। সত্যি লাইফ ইজ বিউটিফুল। এই অনুভুতি লেখায় প্রকাশ করা সম্ভব না।

বোটের ওপেন ডেকে মৃদুমন্দ বাতাসে প্রকৃতির এই রূপ আর এই অপার্থিব খাওয়া দাওয়া। সৃষ্টিকর্তার শুকরিয়া আদায় করলাম। চ্যানেল পেরিয়ে কর্ণফুলী নদীতে উঠলাম। এখানে নদী বেশ চওড়া। পাহাড় ছেড়ে কিছুটা সমতল দুইপাশ সেই সাথে চিরচেনা গ্রাম বাংলার দৃশ্য। বেশ কিছুটা সময় অতিক্রান্ত করলাম গল্পগুজব আর ফটোসেশনে। এর মধ্যে প্রকৃতি আবার বিরূপ হওয়ায় সবার ঠাই হোল নিচের ডেকে। পথে ভূষণপুর বিজিবি ক্যাম্পে রিপোর্ট করে আরো প্রায় চল্লিশ মিনিটের মতো পথ অতিক্রম করে পৌঁছলাম ছোট হরিণা বাজারে। বাংলাদেশের একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের লাগোয়া এই গ্রাম। যার দরুন সিকিউরিটির অত্যন্ত বাড়াবাড়ি। এলাকার লোক আমাদের দেখে বেশ অবাকই হলেন। আসলে এখানে কোন ট্যুরিস্ট আসে না। এই বাজার আশপাশের গ্রাম গুলির একটা মিলনস্থল। সবাই এখানে বাজার করতে আসে। প্রতি বৃহস্পতিবারে এখানে হাট বসে। দূর-দুরান্ত থেকে লোকেরা তাদের জুম চাষের পণ্য নিয়ে আসে এখানে বেচা কেনার জন্য। এখান থেকে ট্রলার যোগে পণ্য চলে যায় রাঙ্গামাটিতে, সেখান থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। রাঙ্গামাটির সবচেয় বড় কলার বাজার বসে এখানে। সেই সাথে মিলতে পারে আনারস আর কমলা এবং পেপে।

রাঙ্গামাটির সমতা ঘাট থেকে প্রতিদিন সকাল ৭টা, ১০টা আর বেলা দুইটায় লোকাল লঞ্চ ছেড়ে আসে। একই ভাবে এখান থেকেও প্রতিদিন তিনটা লঞ্চ ছেড়ে যায়। সময় লাগে কমবেশি ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। চাইলে স্পিডবোটেও আসা যায়, সেক্ষেত্রে সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। কিন্তু প্রকৃতি বিরূপ থাকলে স্পীডবোট এভয়েড করাই ভালো। প্রায়শই ঝোরো বাতাসে স্পিডবোট উলটে দুর্ঘটনা ঘটে। হরিণা বাজারের পাশেই ছোট হরিণা গ্রাম। কয়েক ঘর মানুষ নিয়ে এই গ্রাম। বাঙালি আর পাহাড়িরা মিলে মিশে বাস করে এই গ্রামে। এখানে একটা বিজিবি ক্যাম্প আছে। আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বাজারের একমাত্র লজে। এ রিমোট জায়গায় লজ মানে বুঝতেই পারছেন। কল্পনা করে নিন বর্ণনা আর নাই দিলাম। তবে লজের লোকেশন এক কথায় অসাধারণ। সামনে বয়ে চলেছে খরস্রোতা কর্ণফুলী নদী আর দুইপাশে সবুজ পাহাড়। প্রকৃতির প্রেমে পরতে আর কি লাগে। লজে লাগেজ নামিয়ে ফ্রেশ হয়ে বাজারের হোটেলে লাঞ্চ সেরে নিলাম। একটু গড়িয়ে নিয়ে বিজিবি ক্যাম্পে রিপোর্ট করে এলাম। এরপর বাজারের দোকানে আড্ডা চলল রাত ৯টা পর্যন্ত। রাতের খাবার খেয়ে নদীর পাড়ে রাত ১২টা পর্যন্ত চলল দ্বিতীয় দফার আড্ডা।

প্রকৃতির বিরূপতায় কালকের সারাটা দিন একরকম নষ্টই হয়েছে। যদিও প্রকৃতির এই রুপেরও আলাদা একটা মাধুর্য আছে, তবে এই মাধুর্য চায়ের কাপ নিয়ে প্রিয়ার সাথে বসে ব্যালকনিতে উপভোগ করার মতো। চলতি পথে এই বিরূপতা প্রকৃতি উপভোগে বাধাই শুধু সৃষ্টি করে না সেই সাথে মনকেও বিক্ষিপ্ত করে দেয়। কালকের প্রকৃতির বিরূপতায় বিক্ষিপ্ত মন নিয়েই ঘুমাতে গিয়েছিলাম। খুব ভোরে এলার্ম দেয়া থাকলেও তার আর প্রয়োজন পড়লো না। ভোর সারে পাঁচটা থেকেই পন্টুনের লঞ্চের ভেপুর শব্দে আর ঘুমানো গেল না। কাল সারারাত ঝুম বৃষ্টি হয়েছে। রাতে ভালো ঘুম হলেও আরেকটা দিন প্রকৃতির স্বেচ্ছাচারিতার কাছে সঁপে দিতে হবে ভেবে মন খারাপ করেই ঘুম থেকে উঠলাম। কর্ণফুলী নদীর একদম পাড়ে লঞ্চঘাটের লাগোয়াই আমাদের আপাত আবাস, কর্ণফুলী গেস্ট হাউস। চমৎকার লোকেশন, তিনদিকে পাহাড় আর এক দিকে খরস্রোতা কর্ণফুলী নদী। কিন্তু গেস্ট হাউসের করুন হাল আর প্রকৃতির এই অবস্থা খুব বেশি উপভোগের সুযোগ দিল না। ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে নিতেই দেখি বন্ধু রোমেলও উঠে পড়েছে। এমনিতে ট্যুরে গেলে আমার লাথি ছাড়া ও ঘুম থেকে উঠে না কিন্তু আজ লঞ্চের এমন জোরালো ভেপু যে রোমেলের মতো কুম্ভকর্ণকেও শয্যা ছাড়তে বাধ্য করেছে। ব্যালকনিতে গিয়ে আরেকদফা শঙ্কায় মন ভারি হয়ে গেল। আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা। যে কোন সময় ঝর ঝর ঝরে পড়তে পারে। অগত্যা কি আর করা আর একবার স্লিপিং ব্যাগের ভিতর সেধিয়ে গেলাম। ঘুম আসলো না আর কিছুতেই। স্লিপিং ব্যাগের ভেতর থেকেই মাহমুদ ভাইয়ের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম।

এর মধ্যে নাস্তার ডাক আসলে অনেক কষ্টে স্লিপিং ব্যাগ থেকে বের হয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নিচে নামলাম। সবাই দেখি নাস্তা করে নিয়েছে, আমি আর মাহমুদ ভাই শুধু বাকি। নাস্তা করতে করতে হরিণার প্রাক্তন চেয়ারম্যান বিনয় কৃষ্ণ চাকমা বাবু এসে উপস্থিত। উনিই আমাদের এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। অনেকক্ষণ উনার সাথে চায়ের কাপসহ আড্ডা দিচ্ছিলাম আর জেনে নিচ্ছিলাম এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা আর আশে পাশের প্রকৃতি সম্পর্কে। এখান থেকে খুব কাছেই ভারতের মিজোরাম বর্ডার, তাই সিকিউরিটির একটু বেশ বাড়াবাড়িই চলে। এখানে একটা বিজিবি ক্যাম্প আছে, আরেকটা আছে আরেকটু উজানে বড় হরিণায়। এর পর ঠেগামুখ, বাংলাদেশের শেষ সীমান্ত গ্রাম, যেখান দিয়ে কর্ণফুলি নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সীমান্ত সাময়িক উত্তপ্ত থাকায় আমাদের আর সেইমুখো হওয়া হোল না। কথায় কথায় জানতে পারলাম চট্টগ্রাম বন্দর থেকে থেগামুখ পর্যন্ত রাস্তার প্ল্যান পাশ হয়ে আছে। ভারতীয় অংশের রাস্তাও তৈরি, বাংলাদেশের অংশের রাস্তা তৈরি হলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পন্য রাঙ্গামাটি আর ঠেগামুখ হয়ে সরাসরি মিজোরাম চলে যাবে। ভারতীয় সরকার বাংলাদেশ অংশের রাস্তা তৈরির খরচ দিতেও প্রস্তুত, কিন্তু চীনের সংগে সাময়িক শীতল সম্পর্কের কারনে রাস্তা তৈরির কাজ আপাতত স্তগিত হয়ে আছে। এই রাস্তা হলে এখানকার জীবনযাত্রার মানের যে আমূল পরিবর্তন হবে সে কথা আর বলে দিতে হয় না। কিন্তু মনের মধ্যে এক অজানা আশংকাও তৈরি হলো, সেই সাথে এই প্রকৃতিও হারিয়ে যাবে না তো। আজ আমাদের গন্তব্য বরকল আর কাট্টলি বিল পার হয়ে লংগদু হয়ে হরিণা। অনেক দূরের পথ। প্রায় ৭-৮ ঘণ্টার জার্নি, তাই আমাদের গাইড কাম-মাঝি প্রভিন চাকমা বারবার তাড়া দিচ্ছিলেন। কৃষ্ণদার সাথে আড্ডাটা সবে জমে উঠেছে আর এই সময় এই ডাকা ডাকি। কী আর করা দাদাও বুঝলেন অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে, তাই নিজে থেকেই উঠলেন।

হোটেলে আর রেস্টুরেন্টের বিল চুকিয়ে হরিণাকে বিদায় জানিয়ে আবার ১৯ জনের দল সবাই ট্রলারে চড়ে বসলাম। সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। এবার কিছুক্ষণের জন্য যেন প্রকৃতিদেবী একটু সদয় হলেন। রোদ না উঠলেও বৃষ্টির যন্ত্রণা বন্ধ হলো। সবার মুখেই একটু স্বস্তির হাসি। আবার ট্রলারের ডেকে আড্ডা আর ফটোসেশন শুরু হলো। একেকজনের একেক ভঙ্গিমায় ছবি দেখতে দেখতে পেরিয়ে এলাম অনেকটা পথ। পথে ভূষণছড়া আর বরকল বিজিবি ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হলো। মাঝে কিছুক্ষণের জন্য বৃষ্টি বাগড়া দিলেও মোটামোটি আজ প্রকৃতিদেবী প্রসন্নই ছিলেন। বরকল পার হওয়ার পর রীতিমতো রোদেরও দেখা মিলল। এবার কর্ণফুলী নদীর ভাটির দিকে আমাদের যাত্রা। নদীর দুইধারে সবুজ গাছে ছাওয়া পাহাড়ের দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মত চেয়ে রইলাম খানিকক্ষণ। আল্লাহের কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম নিজের দেশের এই রকম অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।

অনেকে অনেক টাকা খরচ করে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়া যায়, তাদের আমি বলবো এর চেয়ে বিশগুণ কম খরচে দেশের এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন আপনি। আশা করি আশাহত হবেন না। এর মধ্যেই রাসেল ভাই আর আরাফ মিলে গত দিনের মতো চানাচুর আর মুড়ি মাখিয়ে ফেলল। সবাই মিলে ওপেন ডেকে প্রকৃতি উপভোগ আর সেইসাথে এই রাজকীয় খাওয়া, সত্যি আমরা ভাগ্যবান। কয়জনের কপালে জুটবে এই সুখ। এর মধ্যে সময় বাঁচাতে আমাদের মাঝি একটা বাইপাসের ভিতর দিয়ে নৌকা পার করে নিয়ে এলেন। এখানে পানির গভীরতা আর স্রোতের তীব্রতা কিছুটা কম। এর মধ্যেই হাসান ভাই আর একজন লাইফ বয়া সহ ট্রলার থেকে দিলেন লাফ আর বাকিরা ব্যাস্ত হয়ে পড়ল এই দৃশ্য ক্যামেরায় বন্দি করে রাখতে। এর মধ্যেই বাকিদের বায়না সবাই পানিতে নামবে। কিন্তু প্রভিন দা সাফ মানা করে দিলেন এইখানে পানির গভীরতা বেড়ে গেছে, স্রোতের তীব্রতাও অনেকখানি, তাই নামা যাবে না। এর মধ্যে পৌঁছে গেলাম দশ নাম্বার বলে একটা যায়গায়। এখানে থেকে থেকে কাপ্তাই লেকের বুকে ছোট ছোট নাম না জানা দ্বীপের মতো আছে। কোনো কোনোটাতে মানুষের বসতি থাকলেও বেশির ভাগই জনমানবহীন। এই রকমই একটা দ্বীপের গায়ে নৌকা ভিড়ালেন প্রভিন দা। এখানে নামা যাবে কিন্তু নেমে পড়লাম আরেক বিপত্তিতে। দ্বীপের চারপাশে কাটা ঝোপের জঙ্গল। কিছু আবার পানিতে ডোবা। অতি উৎসাহী কয়েকজন তারতারি নামতে গিয়ে পা কাটার আঘাতে রক্তাক্ত করলো। অবশেষে দ্বীপের বিপরীত দিক দিয়ে পানিতে নামলাম। এখানেও কাটা ঝোপ আছে তবে পরিমাণে কম।

একে একে লাইফ জ্যাকেট নিয়ে সবাই পানিতে নামল। বেশ কিছুক্ষণ চলল লেকের পানিতে হুটোপুটি। এই অনুভূতি আসলে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভভ না। চারপাশে পাহাড়ের মাঝে এই দিগন্ত বিস্তৃত লেকের পানিতে গোসোল করা সত্যিই ভ্যাগ্যের ব্যাপার। সবাই একবাক্যে স্বীকার করে নিল যে টাকা খরচ করে থাইল্যান্ড গিয়েও বোধহয় এত মজা করা যেত না। আমাদের আরও অনেকটা সময় এখানে কাটানোর ইচ্ছা ছিল। কিন্তু প্রভিন দা তাড়া দিলেন, এখনো যে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। তারপর মাঝপথে কাট্টলি বিল পড়বে, যেখানে ঝরো বাতাস হলে নৌকা উল্টে যেতে পারে। অগত্যা আর কী করা অতৃপ্ত মন নিয়ে আবার ট্রলারে চড়লাম। মাঝে কাট্টলি বিল আর কাট্টলি বাজার পার হয়ে যতক্ষণে লংগদু পৌঁছলাম ততক্ষণে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে।

আশরাফ উদ্দিন আহমেদ (শাকিল)
চিকিৎসক, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল

নিউজ শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *